
দীপাবলি, যা দীপাবলি নামেও পরিচিত, ভারত এবং বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয় সম্প্রদায়ের সবচেয়ে ব্যাপকভাবে পালিত উৎসবগুলির একটি। আলোর উৎসব হিসেবে এটি অন্ধকারের উপর আলোর, অজ্ঞতার উপর জ্ঞানের এবং মন্দের উপর ভালোর জয়ের প্রতীক। ঘরবাড়ি পরিষ্কার করে প্রদীপ, আলপনা ও ফুল দিয়ে সাজানো হয়, এবং সমৃদ্ধি, প্রজ্ঞা ও কল্যাণের জন্য পরিবারগুলি দেবী লক্ষ্মী ও ভগবান গণেশের পূজা করে।
এই নির্দেশিকায় দীপাবলি ২০২৬-এর তারিখ ও মুহূর্ত, পূজার সামগ্রী, ধাপে ধাপে বিধি, প্রধান মন্ত্র, আরতি, উৎসবের তাৎপর্য এবং নিরাপত্তা পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দীপাবলি ২০২৬-এর তারিখ ও লক্ষ্মী পূজার মুহূর্ত
দীপাবলি ও লক্ষ্মী পূজা পালিত হবে রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬, কার্তিক অমাবস্যার রাতে। লক্ষ্মী পূজা সন্ধ্যায়, সূর্যাস্তের পরের সময় প্রদোষ কালে করা হয়। প্রদোষ কাল যখন বৃষের মতো স্থির লগ্নের সঙ্গে মিলে যায়, অনেক ঐতিহ্য সেটিকে বিশেষভাবে শুভ বলে মনে করে।
- দীপাবলি / লক্ষ্মী পূজা: রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
- অমাবস্যা তিথি (আনুমানিক, ভারতীয় প্রমাণ সময়): ৮ নভেম্বর সকাল আনুমানিক ১১:৩০ থেকে ৯ নভেম্বর দুপুর আনুমানিক ১২:৩০ পর্যন্ত
- লক্ষ্মী পূজার মুহূর্ত: সূর্যাস্তের পরের প্রদোষ কালে; যেমন দিল্লিতে সন্ধ্যা আনুমানিক ৫:৩২ থেকে ৭:২৮ পর্যন্ত (ভারতীয় প্রমাণ সময়)
প্রকাশিত পঞ্জিকাগুলির গণনায় সঠিক সময়ের ক্ষেত্রে পার্থক্য আছে। যেমন, একটি পঞ্জিকা বলছে সন্ধ্যা ৫:৩২ থেকে ৭:২৮, আরেকটি বলছে সন্ধ্যা ৬:২৯ থেকে রাত ৮:২৯। সময় শহর অনুযায়ী বদলায়, তাই সঠিক মুহূর্ত কোনো নির্ভরযোগ্য স্থানীয় পঞ্জিকা বা আপনার পারিবারিক পুরোহিতের কাছ থেকে নিশ্চিত করে নিন।
দীপাবলি পাঁচ দিনের উৎসব। ৬ নভেম্বর ধনতেরাস (আমাদের ধনতেরাস ২০২৬ নির্দেশিকা দেখুন) দিয়ে এটি শুরু হয়; এরপর পঞ্জিকা অনুযায়ী ৭ বা ৮ নভেম্বর নরক চতুর্দশী (ছোটি দীপাবলি), রবিবার, ৮ নভেম্বর দীপাবলি ও লক্ষ্মী পূজা, মঙ্গলবার, ১০ নভেম্বর গোবর্ধন পূজা এবং বুধবার, ১১ নভেম্বর ২০২৬ ভাইফোঁটা (ভাই দুজ) আসে।
লক্ষ্মী পূজার সামগ্রী
- দেবী লক্ষ্মী ও ভগবান গণেশের মূর্তি বা ছবি (আপনার পরিবার কুবেরের পূজা করলে তাঁরও)
- একটি উঁচু চৌকি এবং পরিষ্কার লাল বা হলুদ কাপড়
- আমপাতা ও নারকেল সহ পরিষ্কার জলভরা কলস
- প্রদীপ, সুতির সলতে, ঘি বা তেল
- ধূপ, ধুনো, কর্পূর, ঘণ্টা ও আরতির থালা
- ফুল ও মালা (লক্ষ্মীর জন্য ঐতিহ্যগতভাবে পদ্মফুলই প্রিয়)
- কুমকুম, হলুদ, আতপ চাল (অক্ষত) ও চন্দন
- ফল, মিষ্টি ও অন্যান্য নৈবেদ্য
- মুদ্রা, নোট, হিসাবের খাতা অথবা কাজের যন্ত্রপাতি
- প্রবেশদ্বারের জন্য আলপনার উপকরণ
এই তালিকা পারিবারিক ও আঞ্চলিক রীতি অনুযায়ী বদলে নেওয়া যায়। জমকালো আয়োজনের চেয়ে আন্তরিকতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
লক্ষ্মী পূজার বিধি: ধাপে ধাপে আচার
১. ঘর প্রস্তুত করুন
ঘর পরিষ্কার করুন, প্রবেশদ্বার আলপনা ও তোরণ দিয়ে সাজান, এবং দরজা, জানালা ও বারান্দায় প্রদীপ রাখুন। মুহূর্ত শুরুর আগেই সব প্রস্তুতি শেষ করুন।
২. বেদি সাজান
চৌকিতে পরিষ্কার কাপড় বিছিয়ে মূর্তি বা ছবি রাখুন, লক্ষ্মীকে গণেশের ডান দিকে রাখুন। তাঁদের সামনে কলস, ফুল, ফল ও মিষ্টি সাজিয়ে দিন।
৩. সংকল্প করুন
প্রদীপ ও ধূপ জ্বালিয়ে পূর্ব বা উত্তর দিকে মুখ করে বসুন এবং পরিবারের কল্যাণের জন্য ভক্তিভরে পূজা করার সংকল্প করুন।
৪. প্রথমে গণেশের পূজা করুন
যেকোনো আচারের শুরুতে বিঘ্ন দূর করতে গণেশকে আবাহন করা হয়। তাঁর মন্ত্র জপ করতে করতে ফুল, অক্ষত, কুমকুম ও মিষ্টি নিবেদন করুন।
৫. কলস স্থাপন ও পূজা করুন
কলস দিব্য উপস্থিতি ও মঙ্গলের প্রতীক। এতে ফুল ও অক্ষত নিবেদন করুন।
৬. দেবী লক্ষ্মীর পূজা করুন
দেবীকে আবাহন করে জল, ফুল, কুমকুম, হলুদ, ফল ও মিষ্টি নিবেদন করুন। কৃতজ্ঞতা ও একাগ্রতার সঙ্গে তাঁর মন্ত্র জপ করুন; সমৃদ্ধি, শান্তি এবং সম্পদের দায়িত্বশীল ব্যবহারের বিবেকের জন্য প্রার্থনা করুন।
৭. কুবেরের পূজা করুন (ঐচ্ছিক)
আর্থিক স্থিতিশীলতা ও সঠিক বিবেচনার জন্য অনেক পরিবার সম্পদের রক্ষক কুবেরের কাছে প্রার্থনা করে।
৮. হিসাবের খাতা ও মূল্যবান জিনিসের পূজা করুন
ব্যবসায়ী পরিবারগুলি তাদের হিসাবের খাতা ও কাজের যন্ত্রপাতির জন্য চোপড়া পূজা (যা বহি-খাতা পূজা নামেও পরিচিত) করে, আগামী বছরে সততা ও অগ্রগতির জন্য প্রার্থনা করে।
৯. আরতি করুন
লক্ষ্মী ও গণেশের আরতি গাইতে গাইতে জ্বলন্ত প্রদীপ বা কর্পূর দেবতাদের সামনে ঘোরান। তারপর প্রসাদ বিতরণ করুন।
১০. প্রদীপ জ্বালান ও আনন্দ ভাগ করে নিন
ঘরের চারপাশে প্রদীপ রাখুন, পরিবার ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিষ্টি ভাগ করে নিন এবং দানধর্মের কথাও ভাবুন।
লক্ষ্মী পূজার প্রধান মন্ত্র
১. গণেশ মন্ত্র
ॐ गं गणपतये नमः।
বাংলা প্রতিবর্ণীকরণ: ওঁ গং গণপতয়ে নমঃ।
অর্থ: ভগবান গণেশকে প্রণাম; প্রজ্ঞা, সাফল্য ও বিঘ্ন দূর হওয়ার জন্য প্রার্থনা।
২. দেবী লক্ষ্মী মন্ত্র
ॐ श्रीं महालक्ष्म्यै नमः।
বাংলা প্রতিবর্ণীকরণ: ওঁ শ্রীং মহালক্ষ্ম্যৈ নমঃ।
অর্থ: সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্যের দিব্য রূপ দেবী মহালক্ষ্মীকে প্রণাম। আরও জানতে আমাদের লক্ষ্মী মন্ত্র পাতাটি পড়ুন।
৩. শ্রীং বীজ মন্ত্র
ॐ श्रीं नमः।
বাংলা প্রতিবর্ণীকরণ: ওঁ শ্রীং নমঃ।
দেবী লক্ষ্মীর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সংক্ষিপ্ত বীজ মন্ত্র, যা ধ্যান ও প্রার্থনার সময় প্রায়ই জপ করা হয়।
৪. কুবের মন্ত্র
ॐ यक्षाय कुबेराय वैश्रवणाय धनधान्याधिपतये धनधान्यसमृद्धिं मे देहि दापय स्वाहा॥
বাংলা প্রতিবর্ণীকরণ: ওঁ যক্ষায় কুবেরায় বৈশ্রবণায় ধনধান্যাধিপতয়ে ধনধান্যসমৃদ্ধিং মে দেহি দাপয় স্বাহা।
অর্থ: সমৃদ্ধি, প্রাচুর্য এবং জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদের জন্য ভগবান কুবেরের কাছে প্রার্থনা।
মন্ত্র ঐতিহ্যগতভাবে শান্ত মনে, সতর্ক উচ্চারণে, প্রায়ই ১১ বা ১০৮-এর গুণিতকে জপ করা হয়। উপযুক্ত রূপের জন্য আপনার পারিবারিক ঐতিহ্য বা পুরোহিতের নির্দেশ অনুসরণ করুন।
দীপাবলির আরতি
আরতির মাধ্যমেই পূজা সমাপ্ত হয়। পরিবারগুলি ঐতিহ্যগতভাবে দেবী লক্ষ্মী ও ভগবান গণেশের আরতি গাইতে গাইতে জ্বলন্ত প্রদীপ দেবতাদের সামনে ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘোরায়, তারপর প্রার্থনা করে প্রসাদ বিতরণ করে।
- লক্ষ্মী মাতা আরতি: দেবী লক্ষ্মীর আরাধনায় ঐতিহ্যবাহী ওঁ জয় লক্ষ্মী মাতা আরতি পাঠ করুন।
- গণেশ আরতি: ভগবান গণেশের আশীর্বাদ প্রার্থনায় জয় গণেশ দেবা পাঠ করুন।
দীপাবলিতে কেন লক্ষ্মী পূজা করা হয়?
দেবী লক্ষ্মীকে সম্পদ, সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির দেবী হিসেবে পূজা করা হয়, এবং কার্তিকের অমাবস্যার রাতে তাঁর আরাধনা ঘরে প্রাচুর্য, সম্প্রীতি ও কল্যাণের আশা প্রকাশ করে। সম্পদ দায়িত্বের সঙ্গে ব্যবহারের জন্য প্রজ্ঞা ও সঠিক বিচারবুদ্ধি অপরিহার্য বলে তাঁর সঙ্গে গণেশেরও পূজা করা হয়। এখানে সমৃদ্ধি বলতে ব্যাপক অর্থে বোঝানো হয়, যার মধ্যে স্বাস্থ্য, জ্ঞান, দয়া ও পারিবারিক সম্প্রীতিও রয়েছে।
অনেক পরিবারের কাছে দীপাবলি পুরোনো হিসাব মেটানো, নতুন আর্থিক খাতা শুরু করা, প্রিয়জনদের সঙ্গে মিটমাট করা এবং শুভ সংকল্প নিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর সময়ও।
দীপাবলির তাৎপর্য
শ্রীরামের প্রত্যাবর্তন: ঐতিহ্য অনুসারে রাবণকে পরাজিত করার পর রাম, সীতা ও লক্ষ্মণের অযোধ্যায় ফেরার সঙ্গে দীপাবলি যুক্ত; তখন মানুষ সারি সারি প্রদীপ জ্বালিয়ে তাঁদের স্বাগত জানিয়েছিল।
দেবী লক্ষ্মীর পূজা: উত্তর, পশ্চিম ও মধ্য ভারতের বেশিরভাগ অংশে দীপাবলির রাত লক্ষ্মীর উদ্দেশে নিবেদিত।
কালী পূজা: বাংলা, ওড়িশা ও অসমে একই রাত কালী পূজা হিসেবে পালিত হয়।
অন্যান্য ঐতিহ্য: জৈনরা ভগবান মহাবীরের নির্বাণ স্মরণে দীপাবলি পালন করেন, আর শিখরা বন্দী ছোড় দিবস পালন করেন।
অন্ধকারের উপর আলো: প্রদীপ আশা, জ্ঞান এবং অজ্ঞতার উপর ভালোর জয়ের প্রতীক।
নতুন শুরু: অনেক পরিবার ও ব্যবসা এই উৎসবকে নতুন সূচনা হিসেবে দেখে, উপহার বিনিময় করে, আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করে এবং আগামী বছরের পরিকল্পনা করে।
দীপাবলির নিরাপত্তা পরামর্শ
- প্রদীপ স্থিতিশীল, তাপসহনশীল পৃষ্ঠে রাখুন, পর্দা, কাগজ ও অন্যান্য দাহ্য জিনিস থেকে দূরে।
- জ্বলন্ত প্রদীপ বা মোমবাতি কখনও অরক্ষিত রেখে যাবেন না।
- শিশু ও পোষা প্রাণীদের খোলা আগুন ও আতশবাজি থেকে দূরে রাখুন।
- প্রদীপ জ্বালানোর সময় গায়ে ঠিকমতো লাগে এমন সুতির পোশাক পরুন; ঢিলেঢালা সিন্থেটিক কাপড় এড়িয়ে চলুন।
- আতশবাজি সম্পর্কে স্থানীয় নিয়ম মেনে চলুন এবং কম শব্দ ও কম ধোঁয়ার উদ্যাপনের কথা ভাবুন।
- কাছে জল বা অগ্নিনির্বাপক রাখুন এবং আপনার এলাকার জরুরি নম্বর জেনে রাখুন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
১. ২০২৬ সালে দীপাবলি কবে?
দীপাবলি ও লক্ষ্মী পূজা রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬-এ পড়ছে।
২. দীপাবলি ২০২৬-এর লক্ষ্মী পূজার মুহূর্ত কখন?
এটি সূর্যাস্তের পরের সন্ধ্যার প্রদোষ কালে পড়ে; যেমন দিল্লিতে সন্ধ্যা আনুমানিক ৫:৩২ থেকে ৭:২৮ পর্যন্ত (ভারতীয় প্রমাণ সময়)। প্রতিটি শহরের সূর্যাস্ত অনুযায়ী সময় বদলায়, তাই আপনার স্থানীয় পঞ্জিকায় নিশ্চিত করে নিন।
৩. দীপাবলিতে কোন দেব-দেবীর পূজা করা হয়?
দেবী লক্ষ্মী ও ভগবান গণেশ প্রধান দেবতা। অনেক পরিবার কুবেরেরও পূজা করে; কেউ কেউ আঞ্চলিক ঐতিহ্য অনুযায়ী সরস্বতী বা কালীর পূজা করে।
৪. লক্ষ্মী পূজার সময় কোন মন্ত্র জপ করা উচিত?
লক্ষ্মীর জন্য “ওঁ শ্রীং মহালক্ষ্ম্যৈ নমঃ” এবং গণেশের জন্য “ওঁ গং গণপতয়ে নমঃ” ব্যাপকভাবে প্রচলিত।
৫. দেবী লক্ষ্মীকে কী নিবেদন করা উচিত?
পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী ফুল (বিশেষত পদ্ম), ফল, মিষ্টি, কুমকুম, অক্ষত এবং জ্বালানো প্রদীপ।
৬. লক্ষ্মী পূজা সূর্যাস্তের আগে নাকি পরে করা হয়?
সূর্যাস্তের পরে, অমাবস্যা তিথি থাকাকালীন, প্রদোষ কালে।
আপনার ভক্তি চালিয়ে যান
উপসংহার
দীপাবলি ভক্তি, পরিবার ও নবীকরণকে এক সুতোয় বাঁধে। আগে থেকেই পূজার সামগ্রী প্রস্তুত করুন, আপনার শহরের মুহূর্ত নিশ্চিত করুন, ভক্তিভরে মন্ত্র জপ করুন এবং পরিবারের সঙ্গে আরতি করে পূজা শেষ করুন। এই দীপাবলি প্রতিটি ঘরে শান্তি, প্রজ্ঞা, সুস্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধি বয়ে আনুক।
শুভ দীপাবলি ২০২৬!